News Bangla 24×7 Online মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর রাজ্যে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হল এক মহিলা সাংবাদিককে। তাও পুলিশের সামনে।
চব্বিশ ঘণ্টার মুর্শিদাবাদের সাংবাদিক সোমা মাইতি এবং তাঁর চিত্রসাংবাদিক রঞ্জিত মাহাতো জাতীয় সড়ক অবরোধের খবর করতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে আক্রান্ত হন। প্রায় একশো মিটার তাড়া করে, চুলের মুঠি ধরে, রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয় সোমাকে। আর পুরো ঘটনাটাই ঘটে পুলিশের চোখের সামনে।
এটাকে কোনওভাবেই ‘প্রফেশনাল হ্যাজার্ড’ বলে ছোট করা যায় না। কারণ এখানে সাংবাদিকের পেশাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল—রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে একজন নাগরিক কীভাবে দফায় দফায় নিগৃহীত হন, আর পুলিশ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তা দেখে?
ঘটনাস্থলে একটি পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। সাহায্যের জন্য পুলিশকর্মীদের কাছে গিয়েও কোনও সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ। স্থানীয় এক ব্যক্তি টোটো করে আহত সাংবাদিককে উদ্ধার করতে গেলে সেখানেও ফের মারধর করা হয়। শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত অবস্থায় সোমা মাইতিকে বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়। মাথা, পা এবং ডান হাতের লিগামেন্টে গুরুতর চোট পেয়েছেন তিনি।
এখানে প্রশ্ন মহিলা না পুরুষ—সেটা নয়। সাংবাদিক পরিচয় বাদ দিন। প্রশ্ন শুধুই একটাই—পুলিশ যদি সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও একজন নাগরিককে রক্ষা না করে, তবে সেই পুলিশের অস্তিত্বের অর্থ কী?
এই ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য— “মবের মধ্যে ঢুকতে বারণ করো। এটা আমারও হাতে নেই।”
এই এক বাক্যেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের ভয়ংকর আত্মসমর্পণ। যদি সরকারই স্বীকার করে নেয় যে উন্মত্ত জনতার উপর তার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে আইন, পুলিশ, প্রশাসন—সব কিছুর প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
আসলে সমস্যাটা গভীর।
রাষ্ট্র আজ মবকে ভয় পায়। আইনের প্রয়োগ মানেই পরিস্থিতি ‘খারাপ’ হতে পারে—এই অজুহাতে পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে থাকে। তার উপর রাজনৈতিক দায় এড়ানোর প্রবণতা প্রশাসনকে আরও নিষ্ক্রিয় করে তোলে। ফলে আইন ভেঙে ফেলা হয় প্রকাশ্যে, আর শাস্তি হয় না বললেই চলে।
সাংবাদিকরা এখানে বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে। কারণ তাঁরা ঘটনাস্থলে যান প্রশ্ন করতে, নথিভুক্ত করতে, দেখাতে। ক্ষমতার চোখে সেটাই অপরাধ। তাই প্রথম আঘাতটা আসে সাংবাদিকতার উপর। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না—আজ সাংবাদিক মার খাচ্ছেন, কাল সেই একই রাস্তায় মার খেতে পারেন যে কোনও সাধারণ নাগরিক।
যে রাজ্যে সাংবাদিক নিরাপদ নন, সে রাজ্যে নাগরিক নিরাপদ নন—এটা শুধু স্লোগান নয়, কঠিন বাস্তব।
আর পুলিশের সামনে যদি রক্ত ঝরে, তবে সেটি শুধু একজন সাংবাদিকের রক্ত নয়—সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার রক্ত।
প্রশ্নটা তাই আরও বড়—
এই রাজ্যে কি আইন শাসন করবে, নাকি মব?
আর পুলিশ কি রক্ষা করবে, না শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে, আগামী দিনেও রাস্তায় পড়ে থাকবে আরও রক্তাক্ত শরীর—পরিচয় বদলাতে পারে, ভয়ংকর নীরবতা বদলাবে না।

